সবজান্তা – সুকুমার রায় | হাস্যরসাত্মক শিক্ষামূলক গল্প
লেখক: সুকুমার রায়
ভূমিকা
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় হাস্যরসাত্মক গল্প "সবজান্তা"। এই গল্পে সুকুমার রায় অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ ভাষায় এমন এক ছেলের চরিত্র তুলে ধরেছেন, যে সব বিষয়েই নিজেকে বিশেষজ্ঞ মনে করে এবং অন্যদের সামনে বড়াই করতে ভালোবাসে। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও মিথ্যা বড়াই শেষ পর্যন্ত তাকে কী অবস্থায় ফেলে, সেই শিক্ষাই এই গল্পের মূল বিষয়।
সবজান্তা
আমাদের স্কুলে দুলিরাম নামে এক ছাত্র ছিল। তার বাবা একটি খবরের কাগজের সম্পাদক ছিলেন। এই কারণে অনেকেই বিশ্বাস করত, দুলিরাম নিশ্চয়ই সব বিষয়ে অনেক কিছু জানে। দেশ-বিদেশের খবর, ফুটবল, বিজ্ঞান, পাহাড়, যুদ্ধ কিংবা বড় বড় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন— যে বিষয়ই উঠুক না কেন, দুলিরামের উত্তর সবসময় প্রস্তুত থাকত।
সে এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলত যে, অনেক ছাত্র এমনকি কয়েকজন শিক্ষকও তার কথায় বিশ্বাস করে ফেলতেন। সেই কারণেই পণ্ডিতমশাই তার নাম দিয়েছিলেন "সবজান্তা"।
কিন্তু বাস্তবে দুলিরামের জ্ঞানের চেয়ে তার বড়াই করার অভ্যাসই ছিল বেশি। সংবাদপত্রে পড়া দু-চারটি তথ্যের সঙ্গে নিজের কল্পনা মিশিয়ে সে এমনভাবে গল্প বলত, যেন সবকিছু সে নিজের চোখে দেখেছে।
একদিন সে ক্লাসে নায়াগ্রা জলপ্রপাত সম্পর্কে বলতে গিয়ে দাবি করল, "নায়াগ্রা নাকি দশ মাইল উঁচু এবং একশো মাইল চওড়া!" যখন একজন ছাত্র তার ভুল ধরিয়ে দিল, দুলিরাম তখন বলল, "তোমরা খবর রাখো না!" এভাবেই সে সবসময় নিজের ভুল ঢাকার চেষ্টা করত।
এর কিছুদিন পর দুলিরামের এক মামা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে স্কুলের কাছেই বাড়ি নিলেন। তারপর থেকে দুলিরামের বড়াই আরও বেড়ে গেল। সে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল, যেন জেলার সব বড় বড় মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
এমন সময় খবর এল, লোহারপুরের জমিদার রামলাল রায় আমাদের স্কুলে ফুটবল মাঠ তৈরির জন্য তিন হাজার টাকা দান করেছেন। এই খবর নিয়ে স্কুলে সবার মধ্যে উৎসাহের শেষ রইল না।
সুযোগ বুঝে দুলিরাম গল্প শুরু করল— সে নাকি দার্জিলিংয়ে রামলালবাবুর সঙ্গে বহুবার দেখা করেছে, তাঁর বাড়িতে গিয়েছে, এমনকি ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করে তাঁকে মুগ্ধও করেছে।
ছাত্ররা মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনছিল। ঠিক তখনই এক অচেনা ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "রামলালবাবু কেমন মানুষ?"
দুলিরাম বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলতে লাগল, রামলালবাবু নাকি খুব লম্বা, শক্তিশালী, তাঁর সঙ্গে নিয়মিত চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়, এমনকি তিনি দুলিরামকে কুস্তিও শেখানোর কথা দিয়েছিলেন।
ভদ্রলোক শুধু হাসিমুখে সব কথা শুনে চলে গেলেন।
স্কুল ছুটির পরে সবাই যখন বেরোচ্ছে, দেখা গেল সেই ভদ্রলোক দুলিরামের ডেপুটি মামার সঙ্গে গল্প করছেন। মামা দুলিরামকে ডেকে বললেন, "এঁকে প্রণাম করো।"
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, "আমার নাম রামলাল রায়। আমি লোহারপুরের জমিদার।"
এই কথা শুনে দুলিরামের মুখ মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কিছুই বলতে পারল না। লজ্জায় মাথা নিচু করে এক দৌড়ে বাড়ির ভিতরে পালিয়ে গেল।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্ররা হো হো করে হাসতে লাগল। পরের কয়েকদিন সে স্কুলেই এল না। তারপর যখন আবার স্কুলে ফিরল, তখন সবাই শুধু একটি প্রশ্ন করত—
"কী দুলিরাম, রামলালবাবুর চিঠি এসেছে?"
এই একটি প্রশ্নেই সবজান্তার সমস্ত বড়াই মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে যেত।
গল্পের শিক্ষা
- মিথ্যা বড়াই একদিন না একদিন ধরা পড়েই।
- জ্ঞান থাকলে বিনয় থাকা উচিত।
- অহংকার ও অতিরিক্ত আত্মপ্রচার মানুষকে হাস্যকর অবস্থায় ফেলে।
- সত্য সবসময়ই প্রকাশ পায়।
উপসংহার
"সবজান্তা" গল্পটি শুধু হাসির গল্প নয়; এটি আমাদের শেখায় যে, যে ব্যক্তি নিজের অল্প জ্ঞান নিয়ে অহংকার করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজেরই সম্মান হারায়। সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ কখনও নিজেকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেন না।
📚 বাংলা হাস্যরসাত্মক গল্প | নীতিকথা | সুকুমার রায়ের অমর সৃষ্টি
0 মন্তব্যসমূহ